জয়নারায়নপুরে তৈরী টুপি যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে

দারিদ্র বিমোচনে নিরব বিপ্লব
আবদুল্লাহ আল-মামুন: গ্রামের নাম জয়নারায়নপুর, জেলা ফেনী উপজেলা দাগনভূঞা ইউনিয়ন রাজাপুুর। খালের পাড়ে নারিকেল, সুপারি, বাঁশ, আরও শত রকমের গাছ লতাপাতায় ঘেরা ঘন সবুজের গ্রাম জয়নারায়নপুর। দিনমান পাখি ডাকা নিবিড় এ গ্রামেই বেলায়েত হোসেনের বাড়ী। জয়নারায়নপুরের কিছু মানুষ প্রবাসী ও শহর নগর বন্দরে কাজ করেন ঠিকই। কিন্তু এখানেও নগর জীবনের ঢেউ লেগেছে। পাকা রাস্তা, বিদ্যুত আছে এই গ্রামে। একেবারেই আধুনিক ও বিদেশে রপ্তানি করা হয় এমন টুপি তৈরি করা হচ্ছে ছায়াঘেরা বাড়িগুলোয় গড়ে ওঠা কারখানায়।

বেলায়েত হোসেনের পৈত্রিক পেশা সেলাই করা। বাবা সেলাই করতেন। তিনি একট ভিন্ন মাত্রায় তৈরি করেন হস্ত শিল্পের মাধ্যমে নঁকশি করা বাহারী টুপি। ওমানে এর কদর সবচেয়ে বেশি। এছাড়া তানজানিয়া, সোমালিয়া, কাতার, নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এর সীমাহীন চাহিদা রয়েছে। বেলায়েত হোসেন নঁকশি করা বাহারী টুপি তৈরী করে এ অঞ্চলের ধনীদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। তেমনি টুপিতে নঁকশি বা গুটির কাজ করে দাগনভূঞা, সেনবাগ, নাঙ্গলকোট, কোম্পানীগঞ্জ, সোনাগাজী, ফেনী সদর, ছাগলনাইয়াসহ আশে পাশের কয়েক উপজেলায় প্রায় অর্ধ লক্ষ গ্রামীন নারীর কর্মসংস্থান ও পরিবারের বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। আর বেলায়েত হোসেনের অনুকরণে এই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আরো ৩০টির মতো টুপির কারখানা গড়ে উঠেছে।

যেভাবে শুরু ঃ বেলায়েত হোসেন ১৯৮১ সালে দেশে সেলাই এমব্রয়ডারীতে সুবিধা করতে না পেরে ভাগ্যের অন্বেষনে ওমানে রাজধানী মাস্কটে পাড়ি জমান। সেখানে চাকুরীকালে স্থানীয় লোকদের মাথায় তিনি প্রথম নকশি করা টুপি দেখতে পান। তখন থেকে তা শেখার উদ্দিপনা তার ভেতর কাজ করতে থাকে। সে চিন্তা মাথায় নিয়ে কিছুদিন পর ওমানের অপর একটি শহর সালালায় পৌছেন। সেখানে তিনি নকশী করা বাহারী টুপি তৈরী করার কারখানার সন্ধান পান ও কাজ শেখার চেষ্টা করেন। সেখানে পরিচয় হয় হানিফ নামে পাকিস্তানের পাঞ্জাবের এক টুপির কারিগরের সাথে। তার সহযোগী হিসেবে বেলায়েত কাজে লেগে পড়েন। মাত্র ৬ মাসে তিনি টুপি তৈরীর কৌশল রপ্ত করেন এবং সালালায় নিজে দোকান দিয়ে টুপি তৈরী শুরু করেন। উল্লেখ্য তিনিই প্রথম বাংলদেশী যিনি এসব বাহারী নকশী টুপির তৈরীর কাজ প্রথম শেখেন এবং তার কারখানায় প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশীকে উদ্বুদ্ধ করেন ও নিয়োগ দেন। আস্তে আস্তে কারখানার উৎপাদন উন্নত পর্যায়ে পৌছলে তিনি ১৯৯০ সালে আবার মাস্কটে ফিরে আসেন এবং ওখানে একটি টুপির শো-রুম খোলেন। ৩ বছরে তিনি অধিক পরিমান মুনাফা অর্জন করেন এবং বাংলাদেশ থেকে আত্বীয় স্বজনদের সেখানে নিয়ে বেলায়েত দেশে ফিরে এসে নিজ গ্রাম জয়নারায়নপুরে সেভেন স্টার হস্ত শিল্প নামক টুপির কারখানা চালু করেন। প্রথমে হাতে গোনা কয়েকজনকে প্রশিক্ষন দিয়ে কারখানা চালু করেন। পরবর্তীতে কারখানার পরিধি ও লোকবল ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বর্তমানে তার কারখানায় ৪৭ জন কারিগর কাজ করে।

টুপি তৈরীর ধাপ ঃ একটি টুপি তৈরী করতে প্রায় ২ মাস সময় লাগে। নকশি দিয়ে তৈরী বিদেশে রপ্তানী করা এসব টুপি তৈরীতে বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। তার মধ্যে ১১টি ধাপ উল্লেখযোগ্য। প্রথমে টুপির ডিজাইন তৈরী, এরপর সম্পূর্ণ বাংলাদেশী তৈরী কাপড়, কাটিং, আয়রনিং, নকশি ছাপ বসানো, নকশি ছাপের উপর মেশিনের সেলাই, হাসুয়া বা সুতা লুকানো, মহিলাদের হতে নকশি বুনন, পুনঃকাটিং, ধোলাই, পুনঃআয়রনিং ও টপ লাগানো।

উৎপাদন খরচ ঃ বেলায়েত হোসেন জানান, প্রতিটি টুপি তৈরীতে ও ওমানে পাঠানো পর্যন্ত খরচ পড়ে ১ হাজার টাকা থেকে ১১ শ টাকার মতো। কারিগররা জানায়, সাদা কাপড়কে কাটিং করে টুপি তৈরীর উপযুক্ত করা হয়। কাটিং কারিগর প্রতি টুপিতে ১০ টাকা পরিশ্রমিক পায়। এর মধ্যে নকশি করতে হয়। এরপর মেশিনে সেলাই করে নানা ডিজাইন বা নকশার উপর মেশিনে সেলাই করা হয়। প্রতিটি টুপি সেলাইয়ের জন্য শ্রমিকরা ৪০ টাকা পায়। হাসুর কাজের জন্য দেয়া হয় ২০ টাকা। গ্রামীন মহিলারা নকশার উপর সুঁই সুতার পরশ লাগিয়ে ৫শ টাকা থেকে ৬শ টাকার পারিশ্রমিক পায়। তবে টুপিতে নমুনা অনুযায়ী নকশির কাজ করলে একটি টুপিতে সাড়ে ৫শ টাকা থেকে ৬শ টাকা ও ৮০% হলে ৪শ টাকা, ৬০% হলে ৩শ টাকা এবং এর চেয়ে নিম্নমানের হলে টুপি গ্রহন করা হয়না এবং ঐ মহিলা পারিশ্রমিক পায়না। আর নকশি করার সুই সুতা মালিক সরবরাহ করে। মহিলাদের অভিযোগ পরিশ্রম অনুযায়ী নকশির কাজ করে যে টাকা প্রদান করা হয় তা অতি নগন্য।

গ্রামে গ্রামে কারখানা ঃ বেলায়েত হোসেনের হাত ধরে যে টুপির কারখানার সৃষ্টি হয়, সেখানে কাজ করে তৈরীর কৌশল আয়ত্ব করে গ্রামে আরো অনেকে কারখানা গড়ে তোলেন। তারমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো, ভাই ভাই হস্তশিল্প, জনতা হস্ত শিল্প, গ্রামীন হস্ত শিল্প, জনসেবা হস্ত শিল্প, হৃদয় হস্ত শিল্প, জসিম হস্ত শিল্প, আইমান, হস্ত শিল্প নিউ সেভেন স্টার হস্ত শিল্প এবং পাশ্ববর্তী এলাকাগুলোতে সুপার স্টার হস্ত শিল্প,নিউ স্টার হস্ত শিল্প, নিউ সুপার হস্ত শিল্প, ভূঞা হস্ত শিল্প, আলম হস্ত শিল্প ইত্যাদি। এছাড়া যারা তার সালালার কারখানায় কাজ করতো তাদের অনেকেই দেশে এসে বিভিন্ন স্থানে নিজস্ব কারখানা গড়ে তুলেছে।

কর্মসংস্থান ঃ এসব টুপি তৈরির কারখানায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও কাজ করে সাবলম্বী হচ্ছে। অবসর সময়ে ছাত্রী, গৃহিনী, সৌখিন মহিলারা টুপিতে বাহারী নকশার কাজ করে সুঁইয়ের আঁচড়ে পরিবারে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করছে। উপজেলার গ্রামে গ্রামে ও বাড়িতে বাড়িতে মহিলাদের হাতে হাতে এখন টুপি।
কারখানার মালিকরা জানায়, টুপিতে নকশী ও কারখানায় কাজ করে প্রায় দেড় লক্ষাধিক নারী পুরুষ। বেলায়েত জানায়, তার রয়েছে বিভিন্ন জেলায় বড় বড় এজেন্ট, এজেন্টারা কাজ করে ফেনীর বিভিন্ন উপজেলাসহ পটুয়াখালী, নোয়াখালী, ভোলা, কোম্পানীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সিলেট, লক্ষীপুর, রামপুর, রামগতি, নাঙ্গলকোট, চৌদ্দগ্রাম, বাগেরহাট, ব্রাহ্মনবাড়ীয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায়। তারা নকশি ছাপা টুপিগুলো এসব অঞ্চলের মহিলাদের মাঝে সরবরাহ করেন। আর মহিলারা এসব টুপিতে নকশা করে অবসর সময়ে অর্থ উপার্জন করে।
গজারিয়া গ্রামের ঝর্ণা আক্তার জানায়, ঠিকভাবে কাজ করলে একটি টুপিতে নকশি করতে ২৫ দিন থেকে ১ মাস সময় লাগে।
ওমরাবাদের গোলনাহার বেগম জানায়, নকশীর কাজ করে স্বামীর আয়ের সাথে কিছু টাকা যোগ করে তাদের ভালোই দিন কাটছে।
আবদুল নবী গ্রামের ফাহমিদা বিনতে নুর জানায়, সে স্থানীয় ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজে পড়ে। টুপি তৈরির টাকা দিয়ে আসা যাওয়ার ভাড়ার সংস্থান করে। তার মা টুপির নকশীতে তাকে সাহায্য করে।

বিরলীর সৌখিন গৃহিনী মাহমুদা জানায়, তার স্বামী মোস্তফা একজন সরকারী চাকুরীজীবী। স্বামীর আয়ে তাদের পরিবার মোটামুটি ভালো চলে। কিন্তু অবসর সময় বসে থাকার চাইতে তিনি নকশীর কাজ করে আনন্দ পান।

বিদেশে পাঠানো ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ঃ বেলায়েত হোসেন জানায়, ১০ থেকে ১৫ হাজার টুপি হলে তা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তার ওমানের মাস্কটের শো রুমে পাঠান। ওখানে এসব টুপির কদর অনেক বেশি। সেখানে প্রতিষ্ঠিত টুপি প্রকারভেদে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা বিক্রি হয়। বেলায়েত প্রতিমাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করেন। ইতিমধ্যে তিনি গ্রামে অনেক জায়গা জমি কিনেছেন এবং বাংলাদেশের নাভী মহিপালে ৩৫ লাখ টাকার জমি কিনেছেন। ৫ লাখ টাকার পুঁজিতে শুরু করলেও বর্তমানে তা ৫০ লাখ টাকারও বেশি। এছাড়া অন্যান্য কারখানার মালিকরাও নিজের অবস্থার অনেক পরিবর্তন করেছে।

গর্ব ও আক্ষেপের কথা ঃ এত কিছু যে হচ্ছে, তাতে সরকারের কোন সহযোগীতা নেই। অনেকের পুঁজির অভাব কিন্তু তারপরও তারা থেমে নেই। নিজেদের সাবলম্বী করতে প্রাণপনে চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রত্যেকের মনে এ কাজটা নিয়ে গর্ব আছে। তারা ভিন দেশের মানুষের মাথায় পরার টুপি তৈরী করছেন।

ভূঞা হস্ত শিল্পের মালিক সাহাব উদ্দিন ভূঞা জানায়, নকশির ছাপগুলোতে সেলাই করা হয় বিদ্যুত চালিত মেশিনে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বসে থাকতে হয় কারখানার শ্রমিকদের। তারা আরো জানান, সরকারী সাহায্য সহযোগীতা পেলে তৈরি টুপি বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভ^ব। সে সাথে বিশ্বের দরবারে দেশের সুনাম বাড়বে। বিপুল সংখ্যক নারী পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

নোয়াখালীনিউজ/এসইউ/২১ জুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.