বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ‘স্বপ্ন’ বাস্তবায়নের পথে

দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের’ স্বপ্ন এখন বাস্তবায়ন হতে চলছে। এর সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। আগামী ডিসেম্বরে এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য একটি সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়ার কারণে ওই সময়ে না পারলে তা আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে উৎক্ষেপণ করা হবে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, এই স্যাটেলাইট তৈরি হয়েছে ফ্রান্সে। এটি তৈরির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন চলছে এর নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা। স্যাটেলাইটের জন্য দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্র্মাণের কাজও শেষ পর্যায়ে বলে জানা গেছে। আগামী সেপ্টেম্বরে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ শেষ করতে দ্রুত কাজ এগিয়ে চলছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জানান, সবকিছু আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য আমাদের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। আগামী ডিসেম্বরে এটি উৎক্ষেপণের একটি সম্ভাব্য প্রাথমিক সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়া যদি অনুকূলে না থাকে, তাহলে সেটা আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেও উৎক্ষেপণ করা হতে পারে।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হবেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে এটি উৎক্ষেপণ করা হবে। সফলভাবে এই উপগ্রহ মহাকাশে গেলে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হবে বাংলাদেশ। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এই কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এই স্যাটেলাইট দিয়ে সেবা দেয়া সম্ভব হবে না বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি পাঁচ হাজার কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধন নিয়ে ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার। ২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণে ‘স্যাটেলাইট সিস্টেম’ কেনার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়। এ স্যাটেলাইটে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে, যার ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে এবং বাকিগুলো ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ বছরে ১৪ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে বলে সরকার আশা করছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন সংস্থার (আইটিইউ) ‘রিকগনিশন অব এক্সিলেন্স’ পুরস্কারও পেয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ কাজ সরেজমিন দেখতে ১৫ জুলাই গাজীপুরের জয়দেবপুরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের কাজ ৮৮ ভাগ শেষ হয়েছে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশনের কাজ শেষ করা হবে। আর সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ইকুইপমেন্ট টেস্টিং শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, গ্রাউন্ড স্টেশনের মধ্যে ১০ টন ওজনের ২টি অ্যান্টেনা স্থাপন করা হয়েছে এবং ভবন তৈরির কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। বিদ্যুতের জন্য জেনারেটর স্থাপন ও বিদ্যুৎ সরবরাহে ছয়টি বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ডিসেম্বরে উৎক্ষেপণের আগে নভেম্বর থেকে গ্রাউন্ড স্টেশনের পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হবে। আগামী বছরের এপ্রিল থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী।

এদিকে বাজার মূল্যায়ন, বাজারজাতকরণ, বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ, গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল (এসপিআই)। এর প্রতিনিধি শফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, গ্রাউন্ড স্টেশনে সিগন্যাল আদান-প্রদানে ১০ টন ওজনের দুটি অ্যান্টেনা স্থাপনের কাজ চলছে। স্যাটেলাইট কোম্পানি পরিচালনায় মোট ১০৫ জনবল প্রয়োজন হবে বলেও জানান শফিক চৌধুরী।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের ব্যাপারে এর প্রকল্প পরিচালক মো. মেজবাহুজ্জামান বলেন, জয়দেবপুরের গ্রাউন্ড স্টেশনটি মূল স্টেশন, বেতবুনিয়ায় স্টেশনটি ব্যাকআপ হিসেবে রাখা হবে। বেতবুনিয়ায় গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণকাজও একই গতিতে এগিয়ে চলছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্পের সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণের চ্যালেঞ্জিং কাজগুলো শেষ হয়ে গেছে। ১৫ বছর জীবনকালের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের খরচ ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। এ স্যাটেলাইট ব্যবহারের জন্য এর কভারেজ এলাকাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পর আমাদের দেশের টেলিযোগাযোগ, ইন্টারনেট, টিভি চ্যানেলসহ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উন্নতি লাভ করবে।

এ ব্যাপারে প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম জানান, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের তিন বছর পর থেকে আমরা নিজেরাই এটি পরিচালনা করতে পারব। এর মধ্যে আমাদের দক্ষ জনবল তৈরি হয়ে যাবে। ১৮ জনকে প্রশিক্ষণ নিতে ফ্রান্সে পাঠানো হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.