বন্ধু দিবসের উপাখ্যান

মাহমুদ সালেহীন খান

জীবনে বন্ধুর অবদান অন্য কারো মতো নয়। বন্ধুর বিকল্প বন্ধুই। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের ধরনও বহুলাংশে পাল্টেছে। তবে যুগ পাল্টালেও বন্ধুত্বের বন্ধন আদি ও অকৃত্রিম। আর তাই প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মেই গড়ে ওঠে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। বন্ধুত্ব হয় মানুষে-মানুষে, ছেলে-মেয়েতে, ছাত্র-শিক্ষকে, বাবা-মায়ে, পাড়া-প্রতিবেশীতে। জীবন চলার পথে বিভিন্ন স্তরে যেমন- শৈশব, কৈশর, ছাত্রজীবন, কর্মক্ষেত্রে, সংসার ও সমাজ জীবনে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে অনেকের সঙ্গে।

কেন বন্ধু দিবস: পৃথিবীর বয়স এবং মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কের বয়স সমান হলেও দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হচ্ছে খুব বেশি দিন আগে থেকে নয় । বন্ধু দিবসের সূচনা নিয়ে ভিন্ন দুটি তথ্য আছে। একপক্ষের মতে, বন্ধু দিবসের ধারণা ও উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ১৯১৯ সালে সর্বপ্রথম আগস্ট মাসের প্রথম রোববারকে প্রথম ‘বন্ধু দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়েছিল।

এ দিনটির মধ্য দিয়ে পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের মধ্যে কার্ড, উপহার বিনিময় করত। আর তখন থেকেই নাকি বন্ধু দিবসের উৎপত্তি। অন্যপক্ষের মতে, ১৯৩৫ সালে আমেরিকান সরকার এক ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন ওই ব্যক্তির এক বন্ধু আত্মহত্যা করে। সেই দিনটি ছিল আগস্ট মাসের প্রথম রোববার। তখন থেকেই জীবনের নানা ক্ষেত্রে বন্ধুদের অবদান আর আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে আমেরিকান কংগ্রেস ১৯৩৫ সালের আগস্ট মাসের প্রথম রোববারকে ‘বন্ধু দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে বেশকিছু দেশ বন্ধু দিবসের সংস্কৃতিকে সাদরে গ্রহণ করে। এভাবেই বন্ধু দিবস পালনের প্রসার ঘটতে থাকে।

অন্য এক সূত্র অনুযায়ী, বন্ধু দিবসের শুরু হয়েছিল আরো আগে। ১৯১৯ সালে আগস্টের প্রথম রোববার বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে কার্ড, ফুল, উপহার বিনিময় করত। ১৯১০ সালে জয়েস হলের প্রতিষ্ঠিত হলমার্ক কার্ড বন্ধু দিবস পালনের রীতিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছিল। সম্প্রতি বন্ধু দিবসের দিন তারিখ বদলানো হয়েছে। ১৯৫৮ সালে আন্তর্জাতিক নাগরিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড বিশ্বে শান্তির উদ্দেশ্যে প্যারাগুয়েতে ৩০ জুলাইকে বিশ্ব বন্ধু দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেয়। ১৯৫৮ সালের ২০ জুলাই ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেডের প্রতিষ্ঠাতা ড. ঋমান আর্তেমিও ব্রেঞ্চো বন্ধুদের সঙ্গে প্যারাগুয়ের পুয়ের্তো পিনাসকোতে এক নৈশভোজে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সে রাতেই ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডসিপ ক্রুসেড প্রতিষ্ঠা পায়। এই প্রতিষ্ঠানটি ৩০ জুলাই বিশ্বব্যাপী বন্ধু দিবস পালনের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব পাঠায়। প্রায় পাঁচ যুগ পর ২০১১ সালের ২৭ জুলাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৩০ জুলাইকে বিশ্ব বন্ধু দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। তবে এখনো বাংলাদেশ-ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগস্টের প্রথম রোববারই বন্ধু দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আবার কোনো কোনো দেশে ০৮ এপ্রিল বন্ধু দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৯৭ সালে বন্ধু দিবসের এম্বাসেডর হিসেবে বিখ্যাত কার্টুন চরিত্র ‘পু’-কে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত করা হয়। শুধু আগস্টের প্রথম রবিবার নয়, সারা বছর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের বন্ধু দিবস রয়েছে। যেমন- আগস্টের তৃতীয় রবিবার ‘নারী বন্ধু দিবস’, মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ‘বাল্য বন্ধু দিবস’ ও ‘নতুন বন্ধু সপ্তাহ’ রয়েছে। এছাড়া সম্পূর্ণ ফেব্রুয়ারি মাস আন্তর্জাতিক বন্ধু মাস হিসেবে বিভিন্ন দেশে পালন করা হয়।

হলুদ গোলাপ আর ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড: বন্ধু দিবসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে হলুদ গোলাপ আর ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডের মতো বিষয়গুলোও। এ ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডের ধারণাটিও এসেছে আমেরিকা থেকে। আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই বন্ধুত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যান্ড দেয়ার রীতি চালু ছিল। তারা তাদের বন্ধুদের জন্য নিজেরাই ব্যান্ড তৈরি করত। আর যাকে ব্যান্ড দেয়া হতো, সে কখনোই ব্যান্ডটি খুলে রাখত না। অপরদিকে, বন্ধুত্বের প্রতীক হলুদ গোলাপের হলুদ রংটি হলো আনন্দের প্রতীক। হলুদ গোলাপ মানে যে শুধু আনন্দই তা কিন্তু নয়; এটি প্রতিশ্রুতিরও প্রতীক।

এমন তথ্যও রয়েছে যে, বন্ধুদের মাঝে জিনগত সাদৃশ্য থাকে! এক গবেষণার মাধ্যমে একদল বিজ্ঞানী এ তথ্য জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ফার্মিংহাম হার্ট স্টাডির ওই গবেষণায় বলা হয়, মানুষ নিজের সঙ্গে জিনগত সাদৃশ্যপূর্ণ মানুষকে সাধারণত বন্ধু হিসেবে বাছাই করে থাকে। আর সেই মিল এতটাই বেশি যে তা অনেকটা কাজিন ভাইবোনের জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনীয়।

জানা যায়, গবেষকরা ১ হাজার ৯৩২ মানুষের ওপর জরিপ চালান। আত্মীয়দের বাইরে তাদের বন্ধু-বান্ধব ও অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে জিনগত বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণও করা হয়। একই সামাজিক পরিমণ্ডলের মানুষের জিনে প্রায় এক শতাংশ মিল পাওয়া যায়। আর অনাত্মীয় বন্ধুদের মধ্যে জিনগত মিল অনেকটা দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে বিদ্যমান মিলের মতো। প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস সাময়িকীতে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তবে গবেষণায় অংশগ্রহণকারী মানুষের অধিকাংশই ছিল শ্বেতাঙ্গ। আমেরিকায় প্রথম চালু হলেও বন্ধু দিবস এখন আর আমেরিকার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কারণ বিশ্বের অনেক দেশেই এই দিবসটি পালন করছে তাদের নিজের ঐতিহ্য বা সংস্কৃতির সঙ্গে মিল রেখে। তাই বন্ধু দিবস এখন আন্তর্জাতিক একটি উৎসব।

বাংলাদেশে বন্ধু দিবস : শুধু বড় দেশগুলোও নয় আমাদের দেশেও পালিত হয় বন্ধুত্ব দিবস। তবে এখনো সীমিত আকারেই রয়েছে এটি। অন্যভাবে বলতে গেলে প্রাথমিক অবস্থাতেই রয়েছে এর উদযাপন। সমষ্টিগতভাবে তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে এর উদযাপন হয় না। তবে ব্যক্তিগতভাবে উদযাপন একেবারে কম নয়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এসএমএস আদানপ্রদান, কার্ড আদান প্রদান, বই বা অন্য কোনো উপহার বিনিময় করতে দেখা যায় বেশ। ঢাকার বেশ কিছু রেস্তোরাঁ এ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করে থাকে। আবার কিছু বিপণি বিতানে বিভিন্ন পণ্যের ওপর বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। ভারতের মতো বাংলাদেশেও মূলত তরুণদের মধ্যেই এই সংস্কৃতির লালন বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশের ছোট বড় সব শহরের তরুণরা এই দিনে তাদের বন্ধুদের শুভেচ্ছা বিনিময় করে থাকে। তবে গ্রামের দিকে এর উদযাপন লক্ষ করা যায়।

আমেরিকায় বন্ধুত্বের উৎসব : আমেরিকায় অনেক বড় আকারে পালন করা হয় বন্ধু দিবস। ছোট বড় সবাই সমান উৎসাহে মহা সমারোহে পালন করে এই দিনটি। সবাই তার প্রিয় বন্ধুকে শুভেচ্ছা জানানোর একটা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে এই উৎসবকে। শহরজুড়ে যেন একটা সাজ সাজ রব পড়ে যায়। সবাই তাদের প্রিয় বন্ধুর জন্য উপহার কিনতে ঘুরতে থাকে মার্কেটে মার্কেটে।

দিনটাকে আনন্দময় করতে তারা আয়োজন করে নানা ধরনের পার্টির। সবাই মিলে প্ল্যান করতে থাকে কিভাবে কাটানো যায় দিনটা। বন্ধু দিবসউপলক্ষে এই দেশেরবিভিন্ন হোটেল নানা ধরনের সুযোগ সুবিধার ঘোষণা দিয়ে থাকে। মার্কেটগুলোওবন্ধুত্ব দিবসের উপহার সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসে। চারিদিকের পরিবেশ যেন বন্ধুকে আরও কাছে পাবার, বন্ধুর জন্য আরও কিছু করার জন্য উৎসাহিত করে।

ভারতে বন্ধুত্বের উৎসব : বন্ধু দিবস ভারতে নতুন কোনো ধারণা নয়। বিভিন্ন গ্রন্থে এর ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। তবে বন্ধুব দিবসটাকে আলাদা করে উদযাপনের প্রথা উপমহাদেশে পূর্বে ছিল না। উপহার বিনিময়, কার্ড আদান প্রদান, বন্ধুর হাতে রাখি বাঁধা, মোবাইলে এসএমএস বিনিময়, অনলাইনে ই-কার্ড দেয়া-নেয়া প্রভৃতির মাধ্যমে উদযাপন করা হয় বন্ধু দিবসটি। বন্ধু দিবস আসার আগেই সপ্তাহব্যাপী দোকানগুলো নানা রকমউপহার সামগ্রী আর কার্ড সাজিয়ে রাখে। কিছু কিছু রেস্তোরাঁ বিশেষ বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে। আর বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয় বন্ধুত্ব দিবসের কথা। সব মিলিয়ে শহরগুলোতে বন্ধুত্ব দিবসের আয়োজনটা বেশ ভালোই হয়।

মেক্সিকোতে বন্ধুত্বের উৎসব : সারা দুনিয়ায় যেখানে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালন করা হয় সেখানে মেক্সিকোতে এই দিন পালন করা হয় বন্ধু দিবস। এই দিন একই সঙ্গে ভালোবাসা দিবস আবার বন্ধু দিবস পালন করা হয়। বন্ধু দিবস উপলক্ষে সেখানে রেস্টুরেন্টগুলো আয়োজন করে নানা পদের মজাদার খাবারের। বিভিন্ন দোকানে দেখা যায় এ উপলক্ষে বিশেষ বিশেষ উপহারের ঘোষণা।

আর্জেন্টিনায় বন্ধুত্বের উৎসব: ফুটবল খেলার সুবাদে আর্জেন্টিনাকে মোটামুটি এদেশে বিশেষভাবে পরিচিত। খেলার পাশাপাশি কিন্তু তারা বন্ধু দিবসও পালন করে। এই দিন তারা দলবেঁধে কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যায় বা ঘুরতে যায়। আবার কখনো এমনো যে সবাই মিলে কারো বাড়িতেই আয়োজন করা হয় একটা বন্ধুত্ব দিবসের পার্টি। তারপর সে পার্টিতে একজন আরেক জনের সঙ্গে খোশ গল্পে মেতে ওঠে। এমন অনেক বন্ধু আছে যাদের সঙ্গে এমনিতে খুব একটা দেখা হয় না। বন্ধুত্ব দিবসের উছিলায় তাদের সঙ্গেও দেখা হয়ে যায় তাদের। এজন্য সে দেশে বন্ধুত্ব দিবসটাকে বেশ আয়োজন করেই পালন করা হয়।

জাপানে বন্ধুত্বের উৎসব : বন্ধু দিবসে জাপানিরা বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করে। পুরো পরিবার নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যায় তারা। রেস্টুরেন্টগুলো তাদের দরজা বন্ধ করে খাবারগুলো বিক্রির জন্য বাইরে নিয়ে আসে। টেবিল পেতে থরে থরে সাজিয়ে রাখে নানা ধরনের খাবার। সে দেশে পিৎজা বেশ প্রিয়। বন্ধু দিবসের দিন পিৎজার জন্য লাইনে ঘণ্টার ঘণ্টার পর দাঁড়িয়ে থাকে। শহরের লোকদের হাতে হাতে পিৎজা নিয়ে ঘুরতে দেখা যায় হরদম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.