রাতের বিজয় সিংহ দীঘি…

আবদুল্লাহ আল-মামুন: মন হঠাৎ ঘুরতে চাইল। তাতেই সাড়া দিলাম। কোথায় যাবো হুট সিদ্ধান্ত বিজয় সিংহ দীঘির পড়ে। রাতে? দিনে তো অনেক বার গেছি। আজ দেখবো রাতের বিজয় সিংহ।
বুধবার রাত তখন ৯টা ছুই ছুই। দীঘির পাড়ে শুন শান নিরবতা। দীঘির শান বাঁধানো সিড়িতে বসবো আমরা। সিড়িতে ধুলাবালি ফু দিতেই পেয়ে গেলাম একটি ৮ জিবি মেমোরি কার্ড। (তবে সচল কিনা বুঝতে পারছি না)। ফু দিতেই কার্ড পাওয়া নিয়ে শুরু হলো হাসাহাসি। ৯টা ১০ মিনিটের দিকে দীঘিতে দুই জন কর্মজীবি লোক গোসল সারতে এসেছেন। দীঘির নিরবতা তারা ভাংলেন। তাদের ডুব আর পানির চলচল আওয়াজ ভালোই লাগছিল। কয়েকটি ছবি তুলছেন ছিদ্দিক মামা। ছবিতে উঠে এলো রাতে দীঘিটি কেমন শান্ত থাকে। নেই কোন কোলাহল।

দীঘির পাড়ের ষ্টিট লাইটের আলো অন্য রকম লাগছিল। মনে হলো বিশে^র নামি দামী কোন টুরিষ্ট স্পটে বসে আছি। ভ্রাম্যমান পান বিক্রেতা সফি উল্যাহ এর সাথে কথা হয় তিনি দীঘি থেকে পানি নিয়ে পান ধৌত করবেন আর আগামীকাল সে পান গুলো দীঘির পাড়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করবেন। জাকির হোসেন ও শহীদ মিয়া গোসল শেষ করে পাশের টিনশেড বিল্ডিং এ প্রশান্তির ঘুম দেবেন। সকালে আবার জীবন সংগ্রাম, কাজে যোগ দিবেন। ঐতিহাসিক এই দীঘির পাড়ে ঠায় দাড়িয়ে আছে সার্কিট হাউজ, জেলা প্রশাসকের বাস ভবন, পুলিশ সুপারের বাস ভবন, জেলা দায়রা জজ এর বাস ভবন। ফেনী ছাড়া দেশের অন্য কোন জেলায় এরকম এতো সুন্দর পরিবেশে জেলার শীর্ষ ব্যক্তিদের বাস ভবন আছে কি? ভাবছিলাম। তবে এতো কিছুর মধ্যেও মশা ক্ষমা করছে না। না তবুও ভালোই লাগছে। নির্জন পরিবেশ, হালকা হালকা কুয়াশার ঠান্ডা, মিষ্টি চাঁদের আলো, ষ্টিট লাইটের আলো। মিষ্টি চাঁদের আলো, ষ্টিট লাইটের আলো দীঘির পানিতে খেলা করছিল।

মন চাইছে চারপাশ ঘুরতে। যেই ভাবা সেই চলা। নিশিতে যারা মানুষের পকেট কাটে তাদের কথা ভেবে ভয় হচ্ছে। না ভয় পেলে চলবে না। ঘুরে দেখবে পুরো দীঘি। ভালোই লাগলো মামা গান ধরলেন- রাতের তারা ভোরের তারা মাকে জানিয়ে দিস, অনেক কেদেছি আর কাদতে পারিনা। আমরাও ধরলাম। হাটতে হাটতে চোখে পড়লো শান্ত দীঘির জলে অর্ধ ডুবন্ত হয়ে নষ্ট হচ্ছে অনেক দামী একটি সুন্দর বোট। এই বোট ব্যবহার করলে বিনোদন প্রেমীদের ষোল কলা পূর্ন হতো। এতো সব করতে করতে রাত তখন ১০টা ছুই ছুই। রিক্্রা নিয়ে কে যেন আসছে, আরে পর পর দুটি রিক্্রা দাড়ালো একদম শান বাধানো ঘাট বরাবর। না আমরা রিক্্রা চালক গোসল করতে এসেছি। শ্রমজীবি মানুষ দুটোর গোসল করা দৃশ্য অবলোকন করলাম। দীঘির ঠিক পূর্ব উত্তর কোনে নজর গেলো-সুন্দর বড় একটি মসজিদ।

দীঘির পাড়ে পার্ক নির্মাণের কাজ চলছে। গেইট হবে, বসার বেঞ্চ হবে, সুন্দর ফুলের বাগান হবে। নির্মাণ কাজ পরিপূন হলে কতো মনোরম ও আকর্ষণীয় হবে ঐতিহাসিক এই বিজয় সিংহ দীঘি। এতো কিছুর ফাঁকে টিনএইজ কয়েক ছেলে আসছে সিড়িতে বসেছে। হাতে স্মার্ট ফোন, কানে এয়ার ফোন কতক্ষণ বসে তারাও চলে গেল। আমরা তিনজন তারপরও শুন্য শুণ্য লাগছে। আমাদের একজন গিয়ে মিরিন্ডা নিয়ে এলেন একটি দোকান থেকে। ছিদ্দিক মামা মিরিন্ডার ক্যাপ খুললেন, একটু একটু চুমুক দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিলাম। রাত সাড়ে এগারোটা বেজেছে তবে যেতে মন চাইছে না সিগ্ধ এই পরিবেশে ছেড়ে। না ছিদ্দিক মামা দীঘিতে গোসল করতে না পারলে পা ভেজাতে ভুল করলেন না।

ফেনীর ঐতিহ্যবাহী বিজয় সিংহ দীঘির পাড়ে সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ফেনী পৌরসভা। প্রথম পর্যায়ে রাস্তা কার্পেটিং ও ওয়াকওয়ে করা হবে। পর্যায়ক্রমে লাইটিংসহ সৌন্দর্য বর্ধন করা হবে। দীঘির পাড়কে ঢেলে সাজিয়ে ফেনীর অন্যতম বিনোদন স্পট গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে।

ফেনী জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায় বলেন, দীঘিকে ঘিরে একটি নান্দনিক বিনোদন পার্ক গড়ে তোলা হবে। ফেনী শহরে পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্র নেই বললেই চলে। সে বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা এই দীঘির পাড়কে ঢেলে সাজাতে চাই। এ শহরবাসীর প্রাণের চাহিদা ছিলো রাজাঝি ও বিজয় সিংহ দিঘীর পাড়ের সৌন্দর্য বর্ধনের এবং প্রত্যেকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতায় নির্মাণ কাজ চলছে, এ জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানাই।

ঐতিহাসিক বিজয় সিংহ দীঘি :
ফেনী হাজার বছরের পুরনো এক ঐতিহাসিক জনপদ। এর রয়েছে গৌরব গাঁথা ঐতিহ্য। ঐতিহ্যের অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। হাজার বছরের পুরনো বিভিন্ন নির্দশনের চিহ্ন পাওয়া না গেলেও মানবতার কল্যাণে বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য যখন টিউবওয়েলের অস্তিত্ব ছিল না তখন পানি সংকট দূর করতে খনন করা দীঘিগুলো। হিতৈাষী ব্যক্তিদের সৎকর্মের আজও সাক্ষ্য বহন করছে। ফেনীর জেলা সদরসহ উপজেলার গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য দীঘি। এসব দীঘি গুলোতে এখনো মৎস্য চাষ, পাড়ে বনায়নের মাধ্যমে মানুষের উপকারে আসে। গ্রামের দীঘিগুলোতে গোসল করা, বিশ্রাম নেয়া, বিনোদন, গৃহস্থলির নানা সরঞ্জাম ধোয়া, পানি রান্না বান্নার কাজে ব্যবহার হচ্ছে।
তেমনি একটি দীঘি ফেনীর বিজয় সিংহ দীঘি। দীঘিটির পাড়ে বিভিন্ন দিবসে জনতার ঢল নামে। এছাড়াও কর্মব্যস্ত জীবনে একটি প্রশান্তির জন্য শহরবাসী ছুটে আসেন বিজয় সিংহ দীঘির পাড়ে। এসব দীঘি দেখার জন্য জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা প্রতিনিয়ত আসছে। এদিক বিবেচনা করে জেলা প্রশাসন বিজয় সিংহ দীঘির পাড়ে পার্ক নির্মানের কাজ চলছে। ফেনী শহরের অদূরে সার্কিট হাউজের সামনে ঐতিহাসিক বিজয় সিংহ দীঘি অবস্থিত। এরও কোন সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। খুব সম্ভব বিজয় সিংহ গ্রামে অবস্থিত রাজা এর নামে হয় বিজয়সিংহ দীঘি। এটিও ত্রিপুরা’র কোন রাজা ৫/৭’শ বছর পূর্বে খনন করেন। তবে বিজয় সিংহ নামে ত্রিপুরায় কোন রাজা ছিলেন না। অত্যন্ত মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত বিশাল এ দীঘির চৌপাড় খুব উঁচু ও বৃক্ষশোভিত। এর আয়তন ৩৭.৩৭ একর। ফেনীর ঐতিহ্যবাহী দীঘির মধ্যে এটি অন্যতম।

নোয়াখালীনিউজ/এসইউ

Leave a Reply

Your email address will not be published.