সিরিয়া যুদ্ধে মার্কিনীদের অস্তিত্বের লড়াই, পরাজিত হলে আমছালা দু’টোই হারাবে

আনোয়ারুল হক আনোয়ার: আফগান, ইরাক কিংবা লিবিয়া আগ্রাসনে এতদিন মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর মুখোমুখি হতে দেখা যায়নি কোন দেশকে। কিন্তু সিরিয় যুদ্বে মার্কিন বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে রাশিয়া ও ইরান। আমেরিকা ও তার কতিপয় মিত্র আইএস ও আল-নূসরাসহ একাধিক জঙ্গী গোষ্ঠী সৃষ্টি করে সিরীয় সরকারের বিরুদ্বে নিয়োজিত করে। অপরদিকে বাসার আল আসাদ সরকারকে সর্বাতœক সহযোগীতা প্রদান করছে রাশিয়া ও ইরান। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সিরীয় যুদ্বে মার্কিন সমর্থিতরা শোচনীয় পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

আফগান ও ইরাক যুদ্বে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সন্মুর্খীন হন। হাজার হাজার চৌকশ সেনা হতাহত ছাড়াও যুদ্ব পরিচালনা করতে গিয়ে শেষতক পশ্চিমা বিশে^ আর্থিক সংকট দেখা দেয়। বর্তমানে দেশ দু’টিতে মার্কিন সেনা অবস্থান করলেও পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, ”ছেড়ে দে মা-কেঁদে বাচি”র মতই মার্কিন বাহিনীর অবস্থা। আফগান ও ইরাকে ক্ষত শুকাতে না শুকাতে পরোক্ষভাবে লিবিয়া অভিযান শুরু করে পশ্চিমারা। আফ্রিকা মহাদেশে এক সময়ের সমৃদ্ব ও শান্তিপূর্ণ দেশ লিবিয়া আজ নরকে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে অন্তত ৬টি অস্ত্রধারী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।

31-syria-girl-reutersসিরিয় যুদ্বে মার্কিনীদের জড়িয়ে পড়ার একাধিক ঐতিহাসিক কারন নিহিত আছে। প্রথমত, সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল আসাদ ছিল আমেরিকা ও ইসরাইলের চরম বিরোধী। ইসরাইলী আগ্রাসন প্রতিরোধে তৎকালে হাফেজ আল আসাদ ছিলেন আরব জগতের সাহসী নেতা। সে সময় বেকা উপত্যাকায় ত্রিশ হাজার সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে ইসরাইলের বিরুদ্বে প্রতিরোধ গড়ে তোলে সিরীয় বাহিনী। সূদীর্ঘ ৩৩ বছর পর সেখান থেকে আরব শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয় সিরিয়া সরকার। হাফেজ আল আসাদের মৃত্যুর পর তার পুত্র ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদও পিতার পদাঙ্ক অনুসরন করে ইসরাইলের বিরুদ্বে কঠোর অবস্থান নেন। আর এতেই যত বিপত্তি। আমেরিকা ও ইসরাইল বাসার আল আসাদকে হটানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করে। যার অন্যতম হচ্ছে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ব বাঁধানো।

স্বরনীয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল হচ্ছে পশ্চিমাদের ”সোনার ডিম”। ইসরাইলের ভয় দেখিয়ে আরব দেশগুলোকে কব্জা করে মূল্যবান খনিজ সম্পদ লুন্ঠনই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। এছাড়া সামরিক ও অর্থনৈতিক বিশাল স্বার্থও নিহিত রয়েছে। এক কথায় যে সব দেশ ইসরাইলের বিরুদ্বাচরন করবে – তাকে উচিত শিক্ষা দেয়াই হচ্ছে পশ্চিমাদের মূল উদ্দেশ্য। সিরিয়া যুদ্বও এর অন্যতম কারন।

সাত বছর পূর্বে ইরাক, সিরিয়া ও ইরানকে খন্ড বিখন্ড করে সেখানে তাবেদার সরকার গঠনের লক্ষে আইএসআইএস অর্থাৎ islami states of iraq and sams নামক জঙ্গী সংগঠন গড়ে তোলা হয়। প্রথম দিকে আইএসআইএস ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখন্ড দখল করে সেখানে গনহত্যা চালায়। দেড় বছর পূর্বে ইরাক ও সিরিয়া সরকারের প্রতিরোধের মূখে জঙ্গী সংগঠনটি আইএসএস islami states of sams নাম ধারন করে। সাত মাস পূর্বে সিরিয়ার জঙ্গী গোষ্ঠীর বিরুদ্বে সাঁড়াশী অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এতে সফলতাও পেয়েছে সিরিয় সরকার। বিশাল ভূখন্ড পূণরুদ্বার ছাড়াও হাজার হাজার জঙ্গীকে ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে হত্যা করে রাশিয়ার পুতিন সেনা। এসময় বিশে^র মুসলমানদের সূ-দৃষ্টি কামনা এবং ধর্মের লেবাজে জঙ্গী রিক্রুট করার টার্গেট নিয়ে আইএসএস এর নাম পরিবর্তন করে আইএস অর্থাৎ islami states রাখা হয়। কিন্তু এতে হালে পানি মিলেনি আইএস এর। বর্তমানে ইরাক ও সিরিয় রনাঙ্গনে শোচনীয় পরাজয়ের প্রহর গুনছে জঙ্গীগোষ্ঠী। প্রাণ বাঁচাতে এখন চুল দাঁড়ি কেটে এবং বোরকা পরে প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া জঙ্গীগোষ্ঠী।

ইরাক সরকার জঙ্গীদমনে মার্কিন সহযোগীতা প্রত্যাখ্যান করেছে একই ভাবে সিরিয় সরকারও দেশটিতে মার্কিন অভিযানের ঘোর বিরোধী। অর্থাৎ এক প্রকার গায়ে পড়ে সক্রিয় রয়েছে মার্কিন বাহিনী। সিরিয়া যুদ্বকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজা বাদশা শাসিত দেশগুলোতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এর অন্যতম কারনটি হচ্ছে, বাসার আর আসাদ সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকলে রাজতন্ত্রের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। তাই এসব দেশ সিরিয় যুদ্বে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আইএস’কে সহযোগীতা করছে। ইরাক ও সিরিয়ায় প্রতিনিয়ত যুদ্বের মোড় ঘুরে যাচ্ছে। যুদ্বে মার খেয়ে বিদ্রোহীরা শরনার্থীর ছদ্মবেশে ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে গোটা ইউরোপও আইএস আতঙ্কে ভূগছে।

1বিগত তিন দশকে মার্কিনীদের আগ্রাসী কর্মকান্ডে বিশে^র শান্তিকামী জনগন ক্ষুব্দ। আগ্রাসন, নির্বাচিত সরকার পরিবর্তন কিংবা সামরিক ক্যূ ঘটিয়ে তাবেদার সরকার গঠনে মার্কিনীদের জুড়ি নেই। আফগান ও ইরাক আগ্রাসনে মার্কিনীরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সন্মুর্খীন। লিবিয়া ও সিরিয়া আগ্রাসনে এখন নিজেরাই ইমেজ সংকটে ভূগছে। সিরিয়া ইস্যুতে আমেরিকাকে একবিন্দু ছাড় দিবেনা রাশিয়া। আর তাই কোমর বেঁধে যুদ্বে নেমেছে রুশ বাহিনী। অবস্থা বেগতিক দেখে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ঘন ঘন মস্কো সফর করছেন। তারপর বরফ গলাতে পারছেনা। জঙ্গী দমনে সহায়তা কামনা করে ইরাক, আফগান ও ইয়েমেনী সরকার রাশিয়ার সহায়তা চেয়েছে। অর্থাৎ মার্কিনীদের আর কেউ বিশ^াস করতে পারছেনা।

সিরিয় যুদ্বে বাসার আল আসাদ সরকার টিকে গেলে অনেক বন্ধু রাষ্ট্র হারাবে আমেরিকা। আর এ সূযোগটি লুফে নেয়ার অপেক্ষায় রয়েছে মার্কিনীদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ রাশিয়া ও চীন। সুতরাং মরুভূমির চোরাবালিতে আটকা পড়ে মার্কিনীরা আমছালা দু’টোই হারানোর আশংকায় ভূগছে।

লেখক: সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ও ব্যুরো চীফ, দৈনিক ইনকিলাব এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.