ফেনীতে শহীদদের অধিকাংশ বধ্যভূমি ৪৫ বছরেও চিহ্নিত হয়নি!

ফুলগাজী জামমুড়া স্মৃতিস্তম্বের ছবি.. এখানে এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী বৃদ্ধ হাবিবুর রহমান বধ্যভূমি স্মৃতি নিয়ে কথা বলছেন।
ফুলগাজী জামমুড়া স্মৃতিস্তম্বের ছবি.. এখানে এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী বৃদ্ধ হাবিবুর রহমান বধ্যভূমি স্মৃতি নিয়ে কথা বলছেন।

সদর: মহান মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ফেনী জেলা শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে একাত্তরের শহীদদের পাঁচটি বধ্যভূমি অযত্ম ও অবহেলার কারণে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানী হানাদারদের অত্যাচার, নির্যাতন ও নৃশংস গণহত্যার দুঃসহ স্মৃতি বিজড়িত ফেনীর অধিকাংশ বধ্যভূমি ৪৫ বছরেরও চিহ্নিত হয়নি। যেগুলো চিহ্নিত হয়েছে সেগুলো রয়েছে অযত্ম আর অবহেলায়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা ফেনী জেলার বিভিন্নস্থানে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। লাশ ফেলা হয় পুকুর, খাল, নদী , ডোবা-নালায় ও গভীর জঙ্গলে। সরকার পক্ষ থেকে এ সব বধ্যভূমি বা গণকবর সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের কথা থাকলেও যথাযথ উদ্যোগ ও সরকারি কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে আজো বাস্তবায়ন হয়নি। ফেনীর বধ্যভূমিগুলো হচ্ছে- ফেনী সরকারী কলেজ এলাকার বধ্যভূমি, দাগনভূঁঞার রাজাপুর স্কুল এন্ড কলেজ সংলগ্ন চৌধুরী বাড়ির পার্শ্বে অরক্ষিত বধ্যভূমি, ফুলগাজীর জামুড়া গ্রামের বধ্যভূমি, পরশুরামের মালিপাথর বধ্যভূমি ও একই উপজেলার সলিয়া বধ্যভূমি উল্লেখযোগ্য।

অরক্ষিত ফেনী সরকারী কলেজ এলাকার বধ্যভূমি..ছবিতে স্মৃতিস্তম্বের উপর দুই যুবক বসে আছে ।
অরক্ষিত ফেনী সরকারী কলেজ এলাকার বধ্যভূমি..ছবিতে স্মৃতিস্তম্বের উপর দুই যুবক বসে আছে ।

ফেনী কলেজ বধ্যভূমি অরক্ষিত : স্বাধীনতা যুদ্ধে চলাকালে পাক হানাদার বাহিনী বিভিন্ন স্থানে নিরীহ বাঙ্গালিদের নির্বিচারে হত্যা করে ফেনী সরকারি কলেজের পূর্ব দক্ষিণ কোণে এনে লাশ পুঁতে রাখত এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোকজনকে ধরে এনে টর্চার শেলে নির্যাতন শেষে গুলি করে হত্যা করত। এ বধ্যভূমির একাংশের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ফেনী সরকারি কলেজের অনার্স ভবন। ভবনটির পেছনের অংশে বধ্যভূমির কিছু জায়গা জুড়ে রয়েছে ময়লার স্তুপ ও সেফটি ট্যাঙ্ক। গুরুত্বপূর্ণ এ স্থানটি সংরক্ষণ না করেই ক্যা¤পাসের অন্যত্র নির্মাণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ। ফেনী কলেজের অধিকাংশ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী জানে না ফেনী কলেজ ক্যা¤পাসে বধ্যভূমির কথা ও ইতিহাস। ফেনী কলেজের দক্ষিণাংশে বধ্যভূমিটি নির্মিত হলেও সংরক্ষণের অভাবে তা অরক্ষিত রয়েছে। দিন-দুপুরে সেখানে মাদক সেবীদের আড্ডাখানা বসে বলে স্থানীয়রা জানান।

ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ইউনিট কমান্ডার মীর আবদুল হান্নান জানান, জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য বধ্যভূমি রয়েছে, তার মধ্যে ফেনী কলেজের বধ্যভূমিটি একমাত্র চিহ্নিত বধ্যভূমি। তাও এখন পর্যন্ত যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি, রয়েছে অরক্ষিত।

চিহ্নিত হয়নি রাজাপুর বধ্যভূমি : দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর স্কুল এন্ড কলেজের পাশে পাক হানাদার বাহিনী ক্যাম্প গড়ে। এখানে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা, যুবক, নারী ও শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের লোকদের ধরে এনে পাক হানাদার বাহিনী নির্যাতন করা হতো। চৌধুরীবাড়ির পশ্চিম পার্শ্বে ফেনাযুক্ত পুকুরে মুক্তিযোদ্ধা আশরাফকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই স্থানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মারাত্মক আহত হয়ে অল্পের জন্য বেঁচে যান ডাক্তার আবদুল হালিম। যুদ্ধাহত হালিম আজো পিঠের ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন। কিন্তু ওই স্থানটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান পায়নি আজো। সংরক্ষিত হয়নি বধ্যভূমি হিসেবে। আগামী প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, জাতির সোনালী সন্তানদের ত্যাগ তিতিক্ষার কথা তুলে ধরতে চিহ্নিত করার দরকার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গণকবর ও বধ্যভূমির।

দাগনভূঞার রাজাপুরের চিহ্নিত করা হয়নি মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ হত্যা বধ্যভূমি। এ বিষয়ে কথা বলছেন মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম পাটোয়ারী।
দাগনভূঞার রাজাপুরের চিহ্নিত করা হয়নি মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ হত্যা বধ্যভূমি। এ বিষয়ে কথা বলছেন মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম পাটোয়ারী।

স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম পাটোয়ারী জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪৫ বছর পার হলেও রাজাপুরে চিহ্নিত হয়নি আজো বধ্যভূমি। সংরক্ষণে এগিয়ে আসেনি সরকার বা কোন সংস্থা। তিনি আরো জানান, ১৯৭১ সালে রাজাপুর স্কুল এন্ড কলেজে ছিল পাক সেনাদের ক্যাম্প। সেখানে টর্চার শেল হিসেবে ব্যবহার হতো।

ফুলগাজী জামুড়া বধ্যভূমি : ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের ২৬ জন মুক্তিকামী মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এখানে ঘুমিয়ে আছে শরিফা খাতুন, সেতারা বেগম, আবুল মনসুর, জোহরা আক্তার এ্যানী ও সাইফুল ইসলামসহ নাম না জানা শহিদ। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী হাবিবুর রহমান জানান, এখানে ২৬ জন মুক্তিকামী মানুষকে বট গাছের সাথে ঝুলিয়ে নির্বিচারে হত্যা করে পাকসেনারা। এ বধ্যভূমির জেলা পরিষদের অর্থায়নে সদ্য সাবেক প্রশাসক আজিজ আহম্মদ চৌধুরী উদ্যোগে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

পরশুরামের মালিপাথর বধ্যভূমি : পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়ন মালিপাথর নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধা চলাকালে হত্যা করা হয় মুক্তিকামী একই পরিবারে পাঁচ সদস্যকে। প্রাণে রক্ষা পাওয়া ওই শহিদ পরিবারের সন্তান মো. মাওলানা নুরুল আমিন জানান, ওই স্থানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তার বাবা, চাচা, জেঠাসহ পাঁচজনকে। এ বধ্যভূমিটি চিহ্নিত করা হলেও রয়েছে অরক্ষিত।

পরশুরামের সলিয়া বধ্যভূমি : পরশুরাম পৌরসভার সলিয়ায় বধ্যভূমিতে নিরবে শুয়ে আছেন একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞের শিকার একই পরিবারের তিন মুক্তিকামী শহীদ। পরশুরাম উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হুমায়ুন শাহরিয়ার জানান, সলিয়ায় স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনজনকে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকান্ডের স্থানটি আজো চিহ্নিত করা হয়নি। তবে শুনেছি বধ্যভূমি সংরক্ষণের নামে অর্থ বরাদ্দ হলেও কাজ হয়নি।

১৯৭১ এর ২২ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ফেনীর মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিল। ৬ ডিসেম্বর ফেনী হানাদার মুক্ত হয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনীর নৃশংস বর্বরতায় ক্ষত-বিক্ষত ফেনী শহরে স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালীরা বিজয়ের নিশান উড়িয়ে উল্লাস করে স্বজন হারাদের কান্না ভুলে গিয়েছিল। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরুলেও ফেনীতে চিহ্নিত হয়নি অধিকাংশ বধ্যভূমি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা ফেনী সরকারী কলেজ, তৎকালীন সিও অফিসসহ কয়েকটি স্থানে স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছিল। স্বাধীনতার পর জেলার বিভিন্ন স্থানে আটটি বধ্যভূমিতে শহীদদের লাশ শনাক্ত করতে ছুটে বেড়িয়েছিল স্বজন হারারা। মুত্তিযোদ্ধারা জেলায় সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি (বর্তমানে ফেনী কলেজের কলা ভবনের পেছনে) শনাক্ত করলেও আজও তা সংরক্ষন হয়নি। বর্তমানে এখানে ফেনী সরকারী কলেজের পয়ঃনিস্কাশনের বর্জ্য ফেলা হয় প্রতিনিয়ত।

ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এ ইতিহাস স্মরণ করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানাতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ অভিযোগ করেন, অমর শহিদদের স্মৃতির ভাস্কর হিসেবে শহরের জেল রোডের পাশে বীর শহিদদের নামের তালিকা সম্বলিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর অনেকগুলো রণাঙ্গনের মধ্যে সীমান্তবর্তী বিলোনিয়ার যুদ্ধ, মুন্সীর হাটের মুক্তারবাড়ী ও বন্ধুয়ার প্রতিরোধের যুদ্ধ ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে। এ রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরের যুদ্ধ কৌশল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানী মিলিটারী একাডেমীগুলোতে পাঠসূচীর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা এ রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের অংহকার আর গর্বের বিষয়। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান দেখতে ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায় যেতে অনুরোধ জানান বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

আবদুল্লাহ আল মামুন/এমআরআর/৫ ডিসেম্বর

One Response to "ফেনীতে শহীদদের অধিকাংশ বধ্যভূমি ৪৫ বছরেও চিহ্নিত হয়নি!"

  1. Josepharife   July 22, 2017 at 1:10 pm

    buy viagra cialis levitra
    cialis online
    cialis how to buy
    cialis cheap
    cialis wholesale canada

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.