ঈদে লাল পাঞ্জাবী দেখলে মায়ের কথা মনে পড়ে

মু গোলাম কিবরিয়া রাহাত
মু গোলাম কিবরিয়া রাহাত

রাতুলের বয়স ৯ বছর সে মাইজদী শহরে একটি বেসরকারী স্কুলে ৩য় শ্রেনীতে পড়ে। আজ ২৯ রমজান আগামিকাল ঈদ। মাগরিবের আযান হলো রাতুল বড় ভাইয়ের সাথে মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করলো। বড় ভাই রাহাত তাকে চাঁদ দেখাতে উত্তর পাড়ার মাঠে নিয়ে গেল। মাঠের আশেপাশে তেমন কোন গাছ নেই। তাই মাঠ থেকে আকাশ পরিষ্কার দেখা যায়।

রাতুল উত্তর পাড়ায় এসে চাঁদ দেখতে পেল। এ দিকে চারদিকে মসজিদে ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক বলছে। উত্তর পাড়ার মাঠে গ্রামের অনেক ছেলে মেয়ে ও তাদের বাবা-মা এসে সবাই চাঁদ দেখছে। গ্রামের ছেলেরা একসাথ হয়ে গান করছে। সবার মুখে একটা ধ্বনি ও গো রমজানের ও রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ; ঈদ মোবারক ঈদ মোবারক ঈদ মোবারক।

রাতুল তার ভাইয়ার সাথে চাঁদ দেখে মহা খুশি। সে ভাইয়ার হাত ধরে বাড়িতে চলে এলো। রাতুল বাড়ীতে এসে আম্মুকে সালাম দিয়ে বলে ঈদ মোবারক, আম্মু ও প্রতি উত্তরে ঈদ মোবারক বলেন। রাত পোহালেই ঈদ। রাতুলদের পরিবারের কেউ নতুন কোন জামাকাপড় কিনেনি। রাতুলের বাবা ঢাকা একটি অফিসে চাকুরী করে।

ঢাকা থেকে পরিবারের সকলের জন্য নতুন জামা-কাপড় নিয়ে আসবে। বাবা সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিলো। ফিরতে হয়তো রাত ৯ টা ১০ টা লাগবে। রাত ৮ টা বাজে এশার আজান দিলো। রাতুল বড় ভাই রাহাতের সাথে যথারীতি মসজিদে গেল এবং নামায আদায় করে বের হলো বড় ভাই রাহাতের সাথে।

বের হওয়ার সাথে সাথে রাহাতের মোবাইলে কল বেজে উঠলো। আব্বু তাকে ফোন করেছে। ফোন রিসিভ করে রাহাত আব্বুকে সালাম দিলো। আব্বু বলে রাহাত তুমি বাড়ী থেকে দত্তেরহাটে আসো আমি আসতে ২০ মিনিট সময় লাগবে। রাতুল বলে ভাইয়া কার ফোন। ভাইয়া তাকে উত্তর দিলো আব্বু ফোন করেছে।

আমাকে দত্তেরহাটে যেতে হবে। তুই বাড়ীতে চলে যা। রাতুল বলে ভাইয়া আমি তোমার সাথে যাবে। রাতুলকে আটকানো যাচ্ছে না। রাহাত আম্মুকে ফোন করলো। আম্মু আমি রাতুল কে নিয়ে আব্বুকে এগিয়ে আনতে দত্তের হাটে যাচ্ছি। আম্মু বলেন সাবধানে যাও, ফি আমানিল্লাহ। রাতুল ও রাহাত মিলে বিনোদপুর বাজার হয়ে রিক্সা করে দত্তের হাটে যাবে।

বিনোদপুর বাজারে এসে রাতুলের সাথে দেখা হলো তার মামাতো ভাই মিশু ও মামতো বোন ফারার সাথে। মিশু ভাই ফারাকে নিয়ে মাইজদীতে মার্কেট করতে গেল। ফারা রাতুলকে দেখে বলে রাতুল ভাইয়া আমাকে একটি সুন্দর লাল জামা কিনে দিলো। রাতুল প্রতি উত্তরে বলে আমার আব্বু আমার জন্য লাল পাঞ্জাবী ও পায়জামা ঢাকা থেকে নিয়ে আসবে।

রাহাত মিশু ভাইকে বলে আব্বু আসবে আমি রাতুলকে নিয়ে দত্তেরহাটে যাচ্ছি। মিশু ভাইকে আল্লাহ হাফেজ বলে রাহাত আর রাতুল রিক্সা করে দত্তেরহাটে গেল। যাওয়ার কিছুক্ষন পর আব্বু একুশ একপ্রেস গাড়ি থেকে নেমে এলো। রাতুল আব্বুকে দেখে জড়িয়ে ধরলো। আব্বু তাকে একটি আদর দিলো ব্যাগ-পত্র নিয়ে রিক্সায় আব্বুর কোলে বসে রওনা দিলো।

রাতুল যেতে যেতে আব্বুকে প্রশ্ন করে আব্বু আমার জন্য কি এনেছো? আব্বু বলে “তোমার জন্য লাল পাঞ্জাবি, পায়জামা, জুতা ও প্যান্ট এনেছি। রাতুলতো মহা খুশি। আব্বু ঘরে ডুকে ব্যাগ থেকে একে একে সাবার জন্য জামা-কাপড় বের করলো কিন্তু রাতুলের পাঞ্জাবী, পায়জামা পেল না।

আব্বু বলে ভুলে দোকানে রয়ে গেল রাতুলের পাঞ্জাবি-পায়জামা। রাতুলের মন খুব খারাপ। রাতুলের দিকে তাকিয়ে আব্বু -আম্মুর মন খারাপ। রাতুলের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কারো সাথে কখা বলছে না। রুমের একপাশে গিয়ে বসে আছে। রাতুলের এমন আবস্থা দেখে আব্বু ও আম্মুর মন খারাপ হয়ে গেছে।

রাতুলের আব্বু রোজা রেখে সারাদিন জার্নি করে খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে। এদিকে ঈদের কোন বাজার করেনি রাতুলদের পরিবার। রাতুলের আব্বু তাঁর আম্মুকে ডেকে বলেন আমি জার্নি করে ক্লান্ত হয়ে গেছি, তুমি রাহাত কে ঈদের বাজার করার জন্য টাকা দাও আর তুমি রাতুল কে নিয়ে মাইজাদী থেকে একটি লাল পাঞ্জাবী আর পায়জামা কিনে নিয়ে আসো।

আম্মু রাহাতকে বাজারের তালিকা আর টাকা দিলো। আর রাতুলকে নিয়ে মাইজদী মার্কেটে চলে গেল। ঈদ মার্কেটে প্রচুর ভিড়। তারপরও অনেক কষ্ঠ করে রাতুলকে নিয়ে আম্মু মার্কেটে আসলো। পছন্দমত মাইজদী বিশাল সেন্টার থেকে লাল পাঞ্জাবী আর পায়জামা কিনলো পনের শত টাকা দিয়ে। নতুন পাঞ্জাবী আর পায়জামা পেয়ে রাতুলতো মহাখুশি।

রাতুল আম্মুসহ রিক্সা করে বাড়ীর পথে রওনা দিলো। মাইজদী উপজেলা পরিষদের সামনে আসলে পিছন থেকে দ্রুত গতির একটি বাস ধাক্কা দিলো।

৫দিন পরে রাতুলের জ্ঞান ফিরে আসলো………………
জ্ঞান ফিরে রাতুল হাত-পা নাড়াতে পারছেনা। সে আম্মু আম্মু বলে ডাকছে। আব্বু তখন এগিয়ে এলো আর বল্লো তোমার আম্মু বাড়ীতে আছে।

রাতুল বলে আমি এখানে কেন? আব্বু বলে তোমার একটা একসিডেন্ট হয়েছে। তাই তোমাকে হাসপাতাল নিয়ে আসছে। রাতুল বল্লো আমি আম্মুর কাছে যাবো। আব্বু তাকে উওর দিলো তোমার আম্মু একটু পরে আসবে। তুমি অপেক্ষা কর।

সকাল থেকে বিকাল হয়ে গেল কিন্তু আম্মু তো আসছে না। বিকালে আবার যখন জিজ্ঞাসা করলো তখন বল্লো রাতে আসবে। রাতে আবার যখন হলো তখন বল্লো সকালে আসবে। রাতুল বলে আমি আম্মরু সাথে মোবাইলে কথা বলবো।

আব্বু চুপ হয়ে গেল। কিছুক্ষন পর উত্তর দিলো- তোমার আম্মু ব্যস্ত আছে, তোমার সাথে পরে কথা বলবে। রাতুলের মনে এখন একটি প্রশ্ন কেন আম্মু তাকে দেখতে আসছে না! ফোনেও তার সাথে কথা বলছে না।

৬দিন পর রাতুল সুস্থ্য হয়ে গেল……………….
এ ৬ দিন আব্বু তাকে আম্মু সকালে, বিকালে, রাতে আসবে বাহনা দিয়ে কাটালো। আজ রাতুল হাসপাতাল থেকে বাড়ীতে চলে যাবে। বাড়ী যাওয়ার জন্য তার মন পাগলপারা। অন্য দিকে আব্বু বলেছে আম্মু বাড়ীতে আছে।

নিজের মধ্যে খুব একটা কৌতুহল বিরাজ করছে। বিকালে হাসপাতাল থেকে বাড়ীর দিকে রওনা দিলো। বাড়ীর সামনে একটা নতুন কবর দেখতে পেল। আব্বুকে জিজ্ঞাস করলো আব্বু কবরটা কার? আব্বু কোন উওর দিলো না। বাড়ীতে পৌঁছে রাতুল আম্মুকে খুঁজতে লাগলো। পুকুর ঘাট, বাড়ীর আশপাশে খুঁজতে লাগলো। কিন্তু কোথাও সে আম্মুকে খুঁজে পেল না।

রাহাত ভাইয়াকে যখন জিজ্ঞাস করলো ভাইয়া আম্মু কোথায় ভাইয়া কোন উওর দিলো না। আম্মু সম্পর্কে কেউ কোন উওর দিচ্ছে না। এদিকে রাতুলকে আম্মুর বিষয়ে কিছু না বলার জন্য আব্বু সবাইকে বারণ করেছে।

কিছুক্ষন পরে মামাতো বোন ফারা এলো রাতুলকে দেখতে। ফারাকে দেখে রাতুল জিজ্ঞাস করলো ফারা আমার আম্মু কোথায়? ফারা বলে তুই যানছ না “তোর আম্মু মারা গেছে” রাস্তায় যে নতুন কবর সেখানে তোর আম্মুকে মাটি দিয়েছে। এ কথা শুনে রাতুলের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। রাতুল এক দোঁড়ে আম্মুর কবরের কাছে চলে গেল।

আর চিৎকার দিয়ে আম্মু আম্মু বলে ডাকতে লাগলো। কিন্তু আম্মু কোন সাড়া দিচ্ছে না। রাতুল বলে আম্মু আমি তোমার রাতুল। আম্মু আমি তোমার কাছে যাবো। এ কথা বলে কবরকে জড়িরে ধরলো। আর রাতুলের চোখ দিয়ে যেন নদী বয়ে যাচ্ছে।

কেউ তাকে কবর থেকে সরাতে পারছেন না। এ দৃশ্য দেখে সাবার চেখে পানি নেমে আসলো। সবাই কাঁদতে লাগলো। আব্বু অনেক কষ্ট করে কবর থেকে রাতুলকে নিয়ে গেল। আব্বু তাকে রক্ত লাল পাঞ্জাবীটা দেখালো। যাতে আম্মুর রক্তের গন্ধ আছে।

এদেখে রাতুল আরো জোরে কাঁদতে লাগলো। এরপর থেকে রাতুল একা একা থাকে। কারো সাথে কথা বলে না। একামনে হাঁসে, কাঁদে, খেলা করে। জিজ্ঞাস করলে বলে, আমি আম্মুর সাথে কথা বলি। একথা শুনে কেউ আর কোন কথা বলে না। কেউ যদি তার কাছে আম্মুর কথা জিজ্ঞাস করে সে বলে আম্মু ঐ নীল আকাশে আছে। ঈদ আসে ঈদ যায়।

রাতুলের লাল পাঞ্জাবী আর পরা হয়না। দেখতে দেখতে ৭ বছর চলে গেল রাতুল এখন ক্লাশ টেনে। আর কারো গায়ে লাল পাঞ্জাবী দেখলে রাতুলের মায়ের কথা মনে পড়ে। সে জানে এ লাল পাঞ্জাবী কিনে আনতে গিয়ে তার আম্মু সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছে।

প্রতি বছরে ঈদে রাতুল আম্মুর কাছে চিঠি লেখে। আম্মুর জন্য খুব কষ্ট হয় রাতুলের সব সময়।

[এ লেখার সাথে বাস্তবে কোন চরিত্রের মিল নেই। যদি কোন পাঠকের জীবনেরসাথে এ লেখা মিলে যায়। তবে লেখকের লেখাটা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন]

মু গোলাম কিবরিয়া রাহাত
সাংবাদিক ও লেখক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.