দেশের সর্ববৃহৎ পৌরসভা ‘হাতিয়া পৌরসভা’

হাতিয়া পৌরসভা কার্যালয়

হাতিয়া: মেঘনা নদীর কুল ঘেঁষে গড়ে উঠা প্রাকৃতিক অপরুপে সজ্জিত আয়তনের দিক থেকে দেশের সর্ববৃহৎ পৌরসভা হলেও নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দিতে ব্যার্থ হচ্ছে নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভা। বিশাল আয়তনের এ পৌরসভাটির নেই কোন নিজস্ব ভবন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভাড়া করা ভবনে পৌর কার্যক্রম পরিচালনা করছে হাতিয়া পৌর কর্তৃপক্ষ।

উন্নত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত নোয়াখালী ‘হাতিয়া পৌরসভা’র ৬৫ হাজার বাসিন্দা। জন্ম-মৃত্যু, ট্রেডলাইসেন্সসহ নানাবিধ সনদ ছাড়া শহর উন্নয়ন প্রায় শূন্যের কোঁঠায়। কাঁচা সড়কের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, আধা পাকা ও পাকা সড়কগুলো যাতায়াতের অনুপোযোগি। নেই উন্নয়ত সেনিটেশন, সুপেয় পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনার বাগাড়। ৩৫ বর্গোকিলোমিটারের এ পৌরসভা চলছে জোড়াতালি দিয়ে। জন্ম থেকেই নেই নিজস্ব ভবন। অন্যের পরিত্যাক্ত টিনের ঘরেই চলছে পৌরসভার কার্যক্রম। পৌরসভার আয়তন উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় বলে মনে করছেন বিশিষ্টরা। অনেকের মতে সরকারের অবহেলাও আরোও একটি কার।

হাতিয়া পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে ২০০৫ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় এ পৌরসভার জন্ম। পৌরসভা করার প্রধান শর্ত মোতাবেক ৮৫ শতাংশ বাসিন্দা অকৃষি নির্ভর হওয়ার কথা থাকলেও পৌর এলাকার ৮৫ শতাংশ মানুষের প্রধান আয়ের উৎস্য কৃষি। তৃতীয় শ্রেণির এ পৌরসভা চর ঈশ্বররায়, তমরদ্দি, বুড়িরচর, লক্ষীদিয়া ও গুল্লাখালিসহ ৫টি মৌজায় ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এখানে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের বসবাস। হোল্ডিং রয়েছে ১০ হাজার ২০০টি। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২২০টি সড়কের অস্তিত রয়েছে। যা প্রায় ৪৪০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩৩০ কিলোমিটার কাঁচা, ৮০ কিলোমিটার আধাকাঁচা (সলিং) ও ৩০ কিলোমিটার পাকা। এর মধ্যে ১০-১৫ কিলোমিটার ছাড়া কাঁচা, আধাকাঁচা ও পাকা সবগুলো সড়কই চলাচলের অনুপযোগি। জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে কাগজে পত্রে ৬ কিলোমিটার পাকা ড্রেণ ও ২০ কিলোমিটার কাঁচা ড্রেণ রয়েছে। এছাড়া ৫০ কিলোমিটার খালও দেখানো হয়েছে। যদিও শহরে সামান্যটুকু পাকা ড্রেণ দেখা গেলেও তা একইবারই অপ্রতুল। কাঁচা ড্রেণ তেমন একটা চোখে পড়েনি। খালের অবস্থা দুরবস্থায় পরিণত হয়েছে। ফলে বর্ষায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।

সূত্র জানায়, সম্পত্তি হস্তান্তর, হোল্ডিং ট্যাক্স, ইজারা, বিভিন্ন সনদ ফি ইত্যাদি মিলেয়ে প্রতি বছর রাজস্ব পাওয়া যায় ৪০-৪২ লাখ টাকা, সরকারিভাবে প্রতি বছর এডিপি থেকে থোক বরাদ্দ মেলে ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে মেয়র, কাউন্সিলরসহ কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন ভাতাই চলে যায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। আর যা থাকে তা দিয়েই চলে উন্নয়নের কাজ। অতিরিক্ত আয়তন হওয়ায় এবং সরকারি বরাদ্দ নিতান্তই অপ্রতুল হওয়ায় অনেকটা জোড়াতালি দিয়েই চলছে উন্নয়ন কার্যক্রম। যা অনুবিক্ষণ দিয়ে খুঁজে পাওয়া মুসকিল হবে। এদিকে পৌর কর্তৃপক্ষ ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ২৭ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৬৭৬ টাকার বাজেট (প্রস্তাবিত) ঘোষণা করেছে। তবে এ বাজেট বাস্তবায়ন কখনও সম্ভব কিনা বিষয়টি কর্তৃপক্ষ নিজেরাও জানে না।

নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভার বয়স প্রায় এক যুগ পার হলেও উন্নয়নের কাঙ্খিত ছোঁয়া পায়নি এ পৌরসভার নাগরিকরা। নিজস্ব কোন ভবন না নাগরিকদের প্রতিনিয়তই নানাবিধ ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ না থাকায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও পৌর নাগরিকদের চাহিদা সঠিক ভাবে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছেনা স্বীকার করেন পৌর মেয়র এ.কে.এম ইউছুফ আলী।

সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, পৌরসভার নিজস্ব কোনো ভবন নেই। এর জন্মই হয়েছে উপজেলা ভূমি অফিসের পরিত্যক্ত একটি টিনসেড ঘরে। সেই থেকে আজ প্রায় এক যুগ ওই ঘরে কার্যক্রম চলছে পৌরসভার। পৌরসভা কার্যালয়ের সামনের সড়ক থেকে শুরু করে শহরের ৯৫ শতাংশ সড়কই চলাচলের অনুপোযোগি। যেটুকু পাকা ড্রেণ রয়েছে সেগুলোও ময়লা-আবর্জনায় ভরে রয়েছে। উছখালি নামে পৌর শহরের ওলি-গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। নেই পরিচ্ছন্ন কর্মি; ময়লা-আবর্জনা ফেলার নেই কোনো নির্দিষ্ট স্থান। নেই ময়লা-আবর্জনা নেয়ার গাড়ি। শহর এলাকায় বিদ্যুৎ আসে বিকাল ৩টায়; যা থাকে রাত ১টা পর্যন্ত। পৌরসভা থেকে কোথাও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। ব্যক্তি উদ্যোগে ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল থেকে কয়েকটি ডিপটিউবওয়েল রয়েছে মাত্র। বেশিরভাগ বাসিন্দারই উন্নত-টেকসই সেনিটেশন ব্যবস্থা নেই। পৌর শহরসহ পৌর এলাকায় ৪টি বাজার থাকলেও নেই সরকারি গণশৌচাগার। অপ্রতুল ড্রেণেজ ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পুরো পৌরসভা জুড়েই শুধু নেই আর নেই।

হাতিয়া নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের জানান, শুধুমাত্র নামেই পৌরসভা। এখানে কোনো সেবাই নেই। অথচ তারা নিয়মিত পৌর করসহ সকল ট্যাক্স পরিশোধ করছে। দেশের সর্ববৃহৎ আয়তনের এ পৌরসভাটির ড্রেইনেজ ও পয়:নিষ্কাশন ব্যাবস্থা,প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাবস্থা ও সুপেয় পানির ব্যাবস্থাসহ কোন অত্যাধুনিক ব্যাবস্থা না থাকায় ক্ষুদ্ধ পৌরবাসী।

পৌরসভার একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি জানান, তৎকালীন সরকারের সময় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় পৌরসভা করেছে। যার কোনো দরকারই ছিল না। অনেক তথ্য গোপন রেখে তখন রাতারাতি এখানে পৌরসভা গঠন করা হয়। দেখা গেছে প্রধান প্রধান শর্তগুলো মিথ্যা তথ্য দিয়ে পুরন করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পৌর বাসিন্দাদের অকৃষি দেখানো হয়েছে। অথচ পৌর এলাকার ৮৫ শতাংশ মানুষই কৃষিজীবি, অস্বচ্ছল, হতদরিদ্র। ফলে দেখা গেছে শতকরা ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করা সম্ভব হয় না। বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি টাকা হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া রয়েছে। শুধুমাত্র সরকারি ২২টি প্রতিষ্ঠান মোটামুটি হোল্ডিং ট্যাক্স ঠিকমত প্রদান করছে। মিথ্যা তথ্য দেয়ার কারণে বর্তমানে গরীব শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পাচ্ছে না, কৃষকরা স্বল্প খরচে কৃষি যন্ত্রপাতি পাচ্ছে না। ঋণ ও বিনামূল্যে বীজ, সার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সূত্র আরো জানায়, গঠনের শুরু থেকেই এ পৌরসভা উন্নয়ন বরাদ্দে অবহেলার শিকার হয়েছে। প্রায় ৬ বছর পর্যন্ত পৌরসভার কার্যক্রম চলেছে ইউএনও ও স্থানীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে। ফলে দীর্ঘ অর্ধযুগ সরকারি তেমন সুযোগ সুবিধা আসেনি। ২০১১ সালের ১৮ জানুয়ারি প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান মেয়রই এ পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত মেয়র। তিনি দ্বীতিয়বারের মতো দায়িত্ব পালন করছেন। ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও নানা কারণে উন্নয়ন হচ্ছে না। তবে ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রকল্প বিভিন্ন দপ্তরে প্রদান করা হয়েছে। পৌরসভার উন্নয়নে স্থানীয় সংসদসদস্য আয়শা আলী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আরো উদারতা থাকা দরকার বলে মনে করছেন পৌরসভার কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

হাতিয়া পৌরসভার মেয়র এ কে এম ইউছুফ আলী জানান, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারার কথা অকপটে স্বীকার করলেন। পৌর এলাকার উন্নয়নের প্রধান ও প্রথম অন্তরায় এর আয়তন। তারউপর সরকারি বরাদ্দ কম হওয়ায় ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব হয় না। অন্যদিকে বাসিন্দারাও নিয়মিত ট্যাক্স প্রদান করছে না। তারপরও ইতোমধ্যে ওয়াটার এন্ড ড্রেনেজ-সেনিটেশনের একটি বড় প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে অবকাঠামো উন্নয়নসহ পৌর বাসিন্দাদের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব।

স্থানীয় সাংবাদিক তছিল উদ্দিন জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বছরের অধিকাংশ সময় হাজারো পর্যটকের আগমন হলেও এখানের যাতায়ত ব্যাবস্থার নেই কোন দৃশ্যত পরিবর্তন। পৌরসভাটির অধিকাংশ রাস্তা ঘাট চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় স্থানীয়দের দৈনন্দিন যাতায়তে এর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বর্ষাকালে রাস্তা পানিতে ডুবে যাওয়ায় শীক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতেও বেগ পেতে হয়।

পৌরসভায় রাস্তার পাশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাস্টবিন না থাকায় স্থানীয়রা তাদের বাড়িঘরের ময়লা আবর্জনা রাস্তার উপর ফেলছে।এতে অধিকাংশ রাস্তা চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। পৌর এলাকায় কোন সড়ক বাতি না থাকায় সন্ধ্যার পরপরই ভুতুড়ে অবস্থা বিরাজ করে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
এদিকে পৌরসভাটির নিজস্ব কোন ভবন না নাগরিকদের প্রতিনিয়তই নানাবিধ ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। দাপ্তরিক কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পৌর কর্তৃপক্ষকে।

নিজস্ব প্রতিবেদক/এমআরআর/১২ মার্চ

Leave a Reply

Your email address will not be published.