শীতল পাটির গ্রাম অনন্তপুর

আবদুল্লাহ আল-মামুন, ফেনী : শীতল পাটির ঘুম শরীরকে ঠান্ডা ও আরামদায়ক করে তুলে শীতলপাটি গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এখনো গ্রাম গঞ্জ শীতল পাটি বসিয়ে মিষ্টি খাওয়ানো ছাড়া নববধুকে ঘরে তোলা হয়না। কনের সাথে তার শশুর বাড়ীর জন্য বিভিন্ন উপঢৌকনের সাথে একটি শীতল পাটি দেওয়ার নিয়ম এখনো অহরহ চোখে পড়ে। কিন্তু কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে এই পেশা বিলুপ্তির পথে, কিন্তু এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ফেনীর পরশুরামের পৌর এলাকার অনন্তপুর নামের একটি গ্রাম এই গ্রামে প্রতিটি পরিবারই পাটি বানানোর পেশায় নিয়োজিত, তাই ভাবে এই গ্রামকে পাটি গ্রাম বলে পরিচিত। বয়স্করা শীতল পাটি বানালেও কম বয়সীরা সাধারণ পাটি তৈরী করে। শতবছরের পুরানো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এই পাটি গ্রাম। পরশুরামের অনন্তপুর গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে একই দৃশ্য চোখে পড়ে স্কুল পড়–য়া কিশোরী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধা সকলেই পাটি বানানোর কাজে ব্যাস্ত থাকে। তাদের সাথে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ও সমনতালে পাটি বানানোর কাজে ব্যস্ত থাকেন। এটা অনন্তপুর গ্রামের প্রায় সবকটি পরিবারের প্রধান পেশা পাটি বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে চলে তাদের সংসার ও ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার খরচ। পাটি বানানো অনন্তপুর গ্রামের লোকজনের অন্যতম আদি পেশা। তাদের আগের বংশধরদেরও পাটি বানানো ছিল একমাত্র পেশা।

অনন্তপুর গ্রামের প্রায় সকলেই হিন্দু ধর্মাবল্বি¦ এই গ্রামের লোকজনের একমাত্র পেশা পাটি বানানো হওয়াতে এই পেশা এত বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পাটি বানানোর পেশা কেউ ছাড়তে চায় না। সেই কারনে এই গ্রামের কেউ বিয়ে করতে গেলে পাত্রির প্রধান যোগ্যতা হতে হবে পাটি বানানোর অভিজ্ঞতা। নিজ গ্রামের যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় চট্টগ্রামের মিরশরাই, করের হাট, ফেনী, সোনাগাজী পাটি বানাতে পারে এমন প্রার্থীরে সাথে বিবাহের সর্ম্পকের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এমন ঘটনা ঘটছে অনন্তপুর গ্রামের লালমোহন নাথের ছেলে সুকেন চন্দ্র নাথে (৪৫) বিয়ে করেন চট্টগ্রামের মিরশরাই থানার পূর্ব মায়ানি গ্রামের মদন গোপাল নাথের কন্যা বকুল রানী নাথ কে বিয়ে করেন কারণ সে পাটি বানাতে পারে। বিয়ের তিন মাস পর থেকে বকুল রানী নাথ পাটি বানানো শুরু করেন। তাদের দুই সন্তান এর লেখা পড়ার খরচ চালাচ্ছেন। গত ১৭ বছর ধরে তার স্বামীর বাড়ীতে পাটি তৈরী করে যাচ্ছেন, অনন্তপুর গ্রামের প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার পাটি তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এছাড়া ও পাশ্ববর্তী কোলাপাড়া গ্রামের একটি অংশের লোকজনও পাটি বানানোই হচ্ছে প্রধান পেশা।
অনন্তপুরের পাটি দিয়ে পরশুরাম উপজেলার ও ফেনীর চাহিদা পূরন হয়। তাছাড়া বাইরের ব্যবসায়ীরা বেশী লাভের জন্য কিনে নিয়ে যায়। শীতল পাটি ছাড়া ও সাধরন পাটি এখানে বানানো হয় ।

শীতলপাটি কিভাবে তৈরী হয়:
শীতল পাটি শরীরকে ঠান্ডা করে এই পাটিতে ঘুমালে আরামদায়ক ঘুম হয় এমন ধারনার কারনেই এই পাটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই পাটি তৈরী করতে ও খুবই কষ্ট হয় শিল্পীদের। প্রথমে পুরুষেরা বাজার থেকে পাটি পাতা কিনে আনেন স্থানীয় ভাবে এর নাম মোর্তাক গাছ বলে, দেখতে বাঁশের কঞ্চির মত মোর্তাক সাধারনত নদী ও পুকুর পাড়ে এবং পরিত্যাক্ত জমিতে হয়। প্রতি আটি মোর্তাকের দাম দেরশ থেকে দুইশ টাকা পর্যন্ত। কাঁচা থাকতে বাড়ীতে এনে পরুষেরা মোর্তাক গাছটি বটি বা দা দিয়ে ছিড়ে ফেলে প্রতিটি গাছকে তিনবার ছিড়তে হয়। প্রথম অংশ নেল আর এই নেল দিয়ে পাটি বানানো হয়। নেল ছাড়া বুকা হয় এটা জালানির কাজে ব্যবহার হয়, আর বুকা ও নেলের মাঝ খানের অংশ দিয়ে আতি বানানো হয় যা দিয়ে যেকোন জিনিস বাধতে পারে। নেল গুলি ছিকন ছিকন করে ছিড়ে গরম পানিতে সিদ্ধ করতে হয়। তারপর ঐ বেতে কখনো রং লাগিয়ে কখনো বা রং ছাড়া পাটি বানানো হয়। একটি ৪/৫ হাতের পাটি বানাতে একজন শিল্পীর ৬/৭ দিন সময় লাগে। অনন্তপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায় প্রতিটি ঘরে শুধু পাটি বানানোর কাজই চোখে পড়ে সরেস চন্দ্র নাথ ও বাবুল চন্দ্র নাথ র্তাা দুই ভাই তাদের দুই ভাইয়ের স্ত্রী পারুল নাথ এবং মালতি নাথ উঠানে বাসে পাটি বানাচ্ছেন। তারা জানান ৪/৫ হাতের একটি পাটি বানাতে ৬ -৭ দিন সময় লাগে। পারুল নাথ ও মালতি নাথ জানান, তাদের মা-বাবা, দাদা দাদিরাও পাটি বানাতো তখনই তারা এটা শিখেছেন এটা পৃর্ব পুরুষের পেশা। তাই তারা এটাকে ছাড়ে না।

বিলুপ্তির পথে এই পেশা :
পরশুরাম কি জন্য বিখ্যাত এক কথায় শীতল পাটি ও চিড়ার জন্য বিখ্যাত ছিল কিন্তু বর্তমানে চিড়া বিলুপ্তি হয়ে গেছে। আর এখন শীতল পাটি ও বিলুপ্তির পথে। এক সময় দুর-দুরান্ত থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়িরা আসত, পরশুরাম এসে শিতল পাটি কিনে নিয়ে যেত। এখানকার লোকজনের অন্যতম পেশা ছিল পাটি বানানো। বর্তমানে অনন্তপুর গ্রাম ব্যতিত অন্য কোন গ্রামে পাটি বানানোর মত লোক নেই বললেই চলে। শুধুমাত্র পার্শ্ববর্তী কোলাপাড়া গ্রামের কিছু অংশে প্রায় অধশতাধিক পরিবার পাটি বানানোর পেশায় রয়েছে। পর্যাপ্ত মোর্তাক গাছের উৎপাদন ও সরবরাহ না থাকায় পাটির উপযুক্ত মুল্য না পাওয়া এবং পাটির বিকল্প রেক্সিনের সহজ লভ্যতার কারনে পাটির চাহিদা কমে গেছে। এছাড়া ও সরকারী ও বেসরকারী কোন ধরনের সহযোগিতা না থাকায় পাটি শিল্প অনেকটা বিলুপ্তির পথে। একসময় পরশুরাম বাজারে বিশাল একটি এলাকা জুড়ে শুধু পাটির বাজার বসত। অনন্তপুর গ্রামের রমেশ চন্দ্র নাথের ছেলে স্বপন নাথ (৫০) জানান, তিনি ও তার স্ত্রী দুজনে পাটি বানায় তাদের একমাত্র পেশাই এটা। তিনি জানান, আগে পরশুরামের অনেক গ্রামের লোকজন পাটি বানাতো কিন্তু এখন পরশুরাম উপজেলার মধ্যে অনন্তপুর গ্রাম ছাড়া আর কোন গ্রামে তেমন কেউ পাটি বানায় না। পর্যাপ্ত পরিমানে মোর্তাক গাছের উৎপাদন না থাকায় পাটি পেশা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

বিভিন্ন রকমের পাটিঃ
শীতল পাটি ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের পাটি বানানো হয় অনন্তপুরে পরিবারের বয়স্করা বেশীর ভাগ শীতল পাটি বানালেও কমবয়সীরা অধিকাংশ সাধারন পাটি বানাতে অভ্যস্ত সাধারন পাটির ছেয়ে শীতল পাটি বানাতে একটু বেশি কষ্ট হয় এবং বেশি দামে বিক্রি হয় চাহিদাও বেশী, শীতল পাটি ও সাধারন পাটির যেমন বিভিন্ন ধরনের মাপের হয় তেমনি বিভিন্ন মুল্যের হয়। অনন্তপুর গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে- প্রায় সকলে হাতের মাপে পাটি বানায় ৪-৫ হাতের একটি সাধারন পাটি ৫ থেকে ৬শত টাকা দরে বিক্রি করে একই মাপের একটি শীতল পাটি ৮শ-১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়। সাড়ে তিন হাত থেকে সাড়ে চার হাতের একটি পাটি ৪শ থেকে ৫শ টাকা একই শীতল পাটির দাম প্রায় ৭শ-৮শ টাকা দরে। এছাড়া ও দোলনা মাপের পাটিও বানানো হয়। এই গ্রামের ননি গোপালের স্ত্রী জোতি রানি নাথ (৬৫) জানায়, আগে পাটি বানানোর পর বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হত কিন্তু এখন অনেকে দুরদুরান্ত থেকে এসে বাড়ী থেকে কিনে নিয়ে যায়।

বিভিন্ন জনের কথাঃ
পরশুরাম পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবু তাহের জানান, অনন্তপুর গ্রামের প্রায় সব পরিবারই পাটি বানানোর সাথে জড়িত তাদের অধিকাংশই শুধুমাত্র পাটি তৈরী করে জীবিকা নির্বাহ করে। বর্তমানে বাইরে থেকে কয়েকটি পরিবার নতুন জমি কিনে বাড়ী করেছে শুধু তারা এই পেশার সাথে জড়িত নয়।
গ্রামীন ব্যাংকের পরশুরাম উপজেলা শাখা ব্যবস্থাপক জানান, তার ব্যাংক থেকে অনন্তপুর গ্রামের প্রায় ৫০টি পরিবারকে পাটি বানানোর জন্য বিভিন্ন সময় ঋন দেওয়া হয়েছে। গ্রামে গীতা রানী নাথ পাটি বানানোর জন্য ৬২ হাজার টাকা, মরু বালা নাথ ২০ হাজার টাকা, লক্ষী রানী নাথ ১০ হাজার টাকা ঋন নিয়েছে, এভাবে ৫০ জন প্রায় ৫ লক্ষ টাকা ঋন নিয়েছে। এবং পরিশোধ করে যাচ্ছে। তবে তারা পাটি বানানোর জন্য নিলেও ব্যাংকর গতানুগতিক নিয়মে ঋন নিয়েছে।
বেসরকারী সংস্থা রিক’র শাখা ব্যবস্থাপক জানান, অনন্তপুরের পাটি বানানোর জন্য তার শাখা থেকে প্রায় ৩০টি পরিবার ঋন নিয়েছে তবে তিনি জানান, পরবর্তীতে বিশেষ সুবিধা দিয়ে পাটি বানানোর জন্য ঋন দেওয়ার পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে।

পরশুরাম উপজেলা চেয়ারম্যেন কামাল উদ্দিন মজুমদার জানান, অনন্তপুর গ্রামের লোকেরা তাদের বাপ-দাদার আমল থেকে পাটি বানানোর পেশায় জড়িত। দুর দুরান্ত থেকে বিভিন্ন লোকজন ও ব্যবসায়ীরা শীতলপাটি কিনতে অনন্তপুর চলে যায়।

নোয়াখালীনিউজ/এ্সইউ/১১ মে

Leave a Reply

Your email address will not be published.